»»বাংলাদেশের ক্রিকেটে কীভাবে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন?
রিচার্ড ম্যাকিন্স: ২০০৩ সালে আমাকে ডাকা হয়েছিল। সেবার দুবছর ছিলাম বাংলাদেশে। অনূর্ধ্ব-১৯, ‘এ’ দল নিয়ে কাজ করেছি, ওদের প্রাথমিক হাই পারফরম্যান্স প্রোগ্রামে আরও উন্নতি করেছি। যথেষ্ট কার্যকর ফলও পেয়েছি। ২০-৩০ জনের যে গ্রুপটি ছিল আমাদের, ওদের প্রায় সবাই জাতীয় দলে খেলেছে এবং অনেকে এখনো খেলছে। খুব উপভোগ করেছি তখন। কিন্তু অনেক কিছু করার বাকি ছিল তখনো। এ জন্যই ২০১২ সালে আবার যখন প্রস্তাব পেলাম, লুফে নিয়েছি। চেয়েছিলাম ২০০৩ সালে যেখানে শুরু করেছিলাম, সেখান থেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।
»» জাতীয় ক্রিকেট একাডেমির দায়িত্ব নেওয়ার সময় কোন দিকগুলোয় উন্নতি করতে চেয়েছিলেন?
ম্যাকিন্স: ২০০৩-২০০৫ মেয়াদে আমি একদল ক্রিকেটার ও কোচের ওপর প্রভাব রাখতে পেরেছিলাম। এর বাইরে কিছু করার মতো অবস্থা ছিল না। দ্বিতীয় মেয়াদে আমি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ক্রিকেটার গড়ে তোলার জন্য শক্ত অবকাঠামো গড়ে তুলতে আগ্রহী ছিলাম। বিশেষ করে জাতীয় দলের গভীরতা বাড়াতে আগ্রহী ছিলাম, পাশাপাশি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের সহায়ক অবকাঠামো উন্নয়নে চেষ্টা করা।
»» সেটা কতটা করতে পেরেছেন?
ম্যাকিন্স: দ্বিতীয় মেয়াদে জাতীয় দলের গভীরতা বাড়াতে ভীষণ আগ্রহী ছিলাম আমি। কিন্তু প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের কথা যদি বলি, কিছুই বদলায়নি। এ জন্য জাতীয় দলের পারফরম্যান্সও আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে। তাই যা চেয়েছিলাম, সেটির ধারেকাছেও যেতে পারিনি। এবারের অভিজ্ঞতা ছিল খুবই হতাশাজনক। কিছু কিছু পরিবর্তন আনার জন্য আমি অসংখ্য প্রস্তাব দিয়েছি, কিন্তু সেগুলোর খুব কমই বিসিবি সভায় আলোচনার জন্য উপস্থাপিত হয়েছে।
»» আপনার কী মনে হয়, বাংলাদেশ এ বছর একটিও উল্লেখযোগ্য ম্যাচ জিততে পারেনি কেন?
ম্যাকিন্স: সত্যি বলতে, বছরের শুরুতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এবং পরে এশিয়া কাপেও কিছু ম্যাচ তারা জয়ের খুব কাছে গিয়ে হেরেছে। স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচেই হেরেছে শেষ বলে। এর প্রথমটিতে হেরেছিল শেষ বলে আম্পায়ারের বাজে এক ভুলে। এরপর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে মূল পর্বে গ্রুপে শক্তিশালী সব দলের বিপক্ষে খেলতে হয়েছে। কাজটি ছিল তাই কঠিন। এর মাস ছয়েক আগেই কিন্তু বাংলাদেশ দেশের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে। কদিন আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে অবশ্য ভালো করতে পারেনি। কিন্তু ওখানে গিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানোর আশা কি সত্যিই তাদের ছিল? সম্ভবত নয়—যদি না কন্ডিশন একদম স্পিনবান্ধব হতো। কিন্তু পুরোনো সমস্যাগুলো সব থেকেই গিয়েছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশে হেরেছে মাঠের ভেতরে-বাইরে কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি বলে।
তাই এই বছরের জয়-পরাজয়ের হারকে প্রাসঙ্গিকভাবে দেখা জরুরি। ওই ম্যাচগুলোর দল ও কন্ডিশন বিবেচনায় নিয়ে ম্যাচের আগে বাংলাদেশের জয় কি আপনি বাস্তবেই আশা করেছিলেন? হ্যাঁ, হয়তো আমরা বাংলাদেশের জয় চেয়েছি। কিন্তু ওদের জয়ের পক্ষে ১০০ ডলার বাজি কি ধরতাম?
»»কোন জায়গাগুলোয় তাদের সমস্যা হচ্ছে ?
ম্যাকিন্স: এ বছর বেশির ভাগ ম্যাচই আমি দেখেছি। ম্যাচ হারার চেয়ে বেশি শঙ্কার আসলে কিছু ম্যাচ যেভাবে হেরেছে। সবচেয়ে হতাশার ছিল ক্রিকেটারদের কয়েকজন মাঠে যেভাবে নিজেদের উপস্থাপন করেছে। ফিল্ডিং, ফিল্ডারকে ব্যাকআপ দেওয়া, রানিং বিটুইন দ্য উইকেটের মতো মৌলিক ব্যাপারগুলোতে যেভাবে নিবেদনের ঘাটতি দেখা গেছে। স্কিল ও অভিজ্ঞতায় শ্রেয়তর দলের কাছে হারলে ঠিক আছে। কিন্তু উৎসাহ, উদ্দীপনা, আচরণ, খেলাটার ছোট ছোট ব্যাপারে হেরে যাওয়ার কোনো অজুহাত বাংলাদেশের মতো একটি দলের থাকতে পারে না। আমার মতে, এটাই সবচেয়ে হতাশার।
»»আন্তর্জাতিক আঙিনায় বাংলাদেশের ভালো না করার পেছনের কারণগুলো কী? প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট নিয়ে কিছু বলবেন !
ম্যাকিন্স: অনেক কারণ। চাইলে কিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিছু যায় না। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের অনেক কিছুই বদলানো যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে হয় তাঁরা বোঝেন না এটিকে সত্যিকারের প্রথম শ্রেণির করতে কী করা প্রয়োজন, কিংবা বুঝেও করতে চায় না। ২০১২-১৩ মৌসুমের কথাই বলি, প্রথম শ্রেণির দলগুলোর প্রাক-মৌসুম বলে কিছু ছিল না। প্রথম ম্যাচের দিন চারেক আগেও কয়েকজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার জানত না কোন দলে খেলবে। এটাই বাংলাদেশে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের প্রতীকী ছবি।
উইকেটের সমালোচনা সহজেই করা যায়। তবে মাটির ধরন বদলানো বা দক্ষ কিউরেটর পাওয়া কঠিন। কিন্তু অন্তত তিন থেকে ছয় মাস আগে প্রথম শ্রেণির টুর্নামেন্টের সূচি দেওয়া, স্কোয়াড গোছানো, কোচিং ও সাপোর্ট স্টাফ নিয়োগ দিয়ে ক্রিকেটারের প্রস্তুতিতে সাহায্য করা এবং মৌসুমজুড়ে শেখার ব্যবস্থা করা—এই কাজগুলো করা কঠিন কিছু নয়। কিন্তু যে সূচি করা হয়, সঙ্গে সড়কপথে ভ্রমণ, সব মিলিয়ে মৌসুম যত এগোতে থাকে, খেলার মান অবধারিতভাবেই পড়তির দিকে থাকে।
»»গত কবছরে বাংলাদেশের ক্রিকেটে উল্লেখযোগ্য এগোতে পারেনি কেন ?
ম্যাকিন্স: বাংলাদেশে ক্রিকেট যেভাবে চালানো হয়, সেটা বদলায়নি। ফলাফলও তাই বদলায়নি। বোর্ড ও ম্যানেজমেন্টের খুব অল্প কজন নিবেদিতপ্রাণ লোকের চেষ্টায় সামান্য উন্নতি হয়েছে। কিন্তু বড় বড় সমস্যার স্রোতে ওই ছোট উন্নতি ভেসে গেছে।
»» বাংলাদেশের বোর্ড ও প্রশাসন নিয়ে আপনার ভাবনা...
ম্যাকিন্স: বিসিবিতে দারুণ কিছু মানুষ কাজ করছেন, ভালো কজন বোর্ড সদস্যই জানেন দেশের ক্রিকেট বদলাতে হলে কী করতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক যে ২৭ জন বোর্ড সদস্যের মধ্যে বেশির ভাগই বোর্ডে আছেন শুধু ক্রিকেট বোর্ডে থাকার জন্যই, কিংবা অন্য কোনো কারণে, কিংবা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নেওয়া আটকাতে। তাদের শক্তির স্রোতে অল্প কজন ভালো বোর্ড সদস্য পাত্তা পান না।
তারা ক্রিকেট দেখে, আইনকানুন জানে, হয়তো খেলাটাকে ভালোও বাসে। কিন্তু প্রাপ্য শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, শক্ত একটা ক্রিকেট-কাঠামো গড়তে কী কী করা প্রয়োজন, তারা জানে না। কারণটা বোধগম্যই, তাদের অনেকেই অভিজাত আন্তর্জাতিক খেলার কোনো দলের সঙ্গে কখনোই সম্পৃক্ত ছিল না।
»» বাংলাদেশের ক্রিকেট থমকে থাকার কারণ কী বলে মনে হয় আপনার ?
ম্যাকিন্স: দিনশেষে, বাংলাদেশের ক্রিকেট এগোয়নি, কারণ কিছুই বদলায়নি। ওরা ক্রিকেটারদের বদলাতে থাকে, কোচিং ও সাপোর্ট স্টাফ বদলাতে থাকে, কিন্তু পর্দার আড়ালের কিছুই বদলায় না। গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে এবং তরুণ ক্রিকেটারদের গড়ে তুলছে। কিন্তু যখন তারা সিনিয়র লেভেলে খেলছে, টিকে থাকতে পারছে না। সিনিয়র ক্রিকেটের কাঠামোরও যদি দ্রুত উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না হয়, ফলও বদলাবে না। দূরদৃষ্টির অভাব, বিসিবির কৌশলগত ও পরিচালনাগত পরিকল্পনায় ঘাটতি বাংলাদেশের ক্রিকেট থমকে থাকার বড় কারণ। সিদ্ধান্ত নির্ভর করে খেয়ালের ওপর কিংবা সিদ্ধান্তপ্রণেতার মুডের ওপর। কোনো নির্দিষ্ট দিকে মনোযোগ দেওয়াকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না, কোনো ক্ষেত্রেই তাই উন্নতি নেই।
»»পরিবর্তন কখন আসবে বলে মনে হয় আপনার ?
ম্যাকিন্স: বাংলাদেশ ক্রিকেটের একনিষ্ঠ সমর্থক আমি, ক্রিকেট নিয়ে গোটা দেশ ও জাতির আবেগটা আমি অনুভব করি। একসঙ্গে কাজ করার জন্য ক্রিকেটাররা দারুণ। কিন্তু খেলাটার ব্যবস্থাপনায় যদি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না আসে, কিছুই বদলাবে না। কীভাবে বদলাবে? একই কাজ বারবার করে যাওয়ায় ভিন্ন কিছু আশা করা কি বাতুলতা নয়?
বিসিবি ক্রিকেট একাডেমিতে কাজ করেছেন দুই দফায়। খুব কাছ থেকে দেখেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। এ দেশে ক্রিকেট যেভাবে চলছে, তা নিয়ে অসন্তুষ্টি ছিল তাঁর প্রবল। বিসিবির চাকরি করেন বলে সে সময় মুখ খুলতে পারেননি। একাডেমির প্রধানের দায়িত্ব ছেড়েছেন গত এপ্রিলে। সম্প্রতি উইজডেন ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রিচার্ড ম্যাকিন্স ধুয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসন ও ক্রিকেট-কর্তাদের—


No comments:
Post a Comment
Thank you very much.