আপনি নিশ্চয়ই চান না মানুষ আপনাকে মনে না রেখে আপনার ব্যবহৃত সুগন্ধিকে খারাপভাবে মনে রাখুক এবং আপনার প্রসঙ্গ উঠলেই বলুক, ‘ও, সেই বোঁটকা গন্ধের আতরমাখা লোকটা!’ সুতরাং সুগন্ধি ব্যবহার করবেন খুব কাছাকাছি (আনুমানিক দুই ফুটের মধ্যে) আসা মানুষটির মধ্যে একটা স্নিগ্ধ, সুরভিত অনুভূতি ছড়িয়ে দেয়ার জন্য–আশেপাশের সবাইকে মাতোয়ারা, পাগলপারা করার জন্য নয়।
গরমকালের ওয়াজ যেমন শীতকালে করা ঠিক না, তেমনি গরমকালের সুগন্ধি শীতকালে ব্যবহার করা মানায় না। আবার রাতের পোশাক যেমন দিনে পরা যায় না, তেমনি রাতের সুগন্ধি দিনে ব্যবহার করা ঠিক না।
সুতরাং সুগন্ধির সঠিক ব্যবহার জানা প্রয়োজন। সুগন্ধি আপনার ব্যক্তিত্ব, মনন, মেজাজ ও রুচিবোধকে প্রকাশ করে। ভাল/হালকা সুগন্ধি অন্যকে আকৃষ্ট করে আর খারাপ/কড়া সুগন্ধি করে ত্যক্তবিরক্ত। কোন্ সুগন্ধি ব্যবহার করবেন তা নির্ভর করবে স্থান, পরিবেশ, ঋতু, সময়, উপলক্ষ্য ও আপনার মন-মেজাজের ওপর।
অফিসে বা কর্মস্থলেঃ
১। গরমের দিনে, গুমোট আবহাওয়ায় অফিসে বা কর্মস্থলে খুব কড়া/উগ্র সুগন্ধি ব্যবহার করতে নেই। উগ্র সুগন্ধির ব্যবহার সহকর্মীদের কাজের প্রতি মনোযোগ নষ্ট করতে পারে এবং এমনকি শারীরিক অস্বস্তি ও অসুস্থতা সৃষ্টি করতে পারে! এজন্য পশ্চিমা দুনিয়ার অনেক প্রতিষ্ঠানে উগ্র সুগন্ধির ব্যবহারই নিষিদ্ধ।
২। তাই সাধারনভাবে কর্মস্থলে মৃদু সুবাসের হালকা সুগন্ধি ব্যবহার করুন।
৩। সস্তা সুগন্ধি ব্যবহার না করে ভাল মানের দামি সুগন্ধিই ব্যবহার করা ভাল, কারণ সস্তা সুগন্ধি সাধারণত উগ্রগন্ধি হয়ে থাকে।
৪। তবে কর্মস্থলের পরিবেশের ওপরও সুগন্ধির ধরণ নির্ভর করবে। বদ্ধ জায়গায় হালকা সুগন্ধি ব্যবহার করুন। আর আপনার কাজের স্থানটি যদি খোলামেলা হয়, তবে সুগন্ধি সামান্য কড়া হলেও ক্ষতি নেই।
৫। আপনার কাজের ধরণটি যদি এমন হয় যে, অনেক গ্রাহকের সরাসরি সংস্পর্শে আসতে হয়, যেমন কোন ব্যাংকের ক্যাশ-পয়েন্টে বা কোন প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক সেবা-দানকারী ফ্রন্ট-অফিসে, তবে হালকা সুগন্ধি ব্যবহার করুন। আর আপনার পেশাটি কোন বিজ্ঞাপনী সংস্থা, চলচ্চিত্র-নির্মাণ বা ফ্যাশন-ডিজাইনিংয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট হলে কড়া সুগন্ধি ব্যবহার করতে পারেন।
৬। মনে রাখবেন, ঘামের দুর্গন্ধ দূর করার ক্ষেত্রে অন্য কোন প্রকারের সুগন্ধি ডিউডোরেন্টের বিকল্প হতে পারে না। তাই একাজে ডিউডোরেন্টই ব্যবহার করুন।
সামাজিক অনুষ্ঠানে বা অন্তরঙ্গ সময়েঃ
১। শীত মওসুমে, সন্ধ্যার পার্টিতে কিংবা বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য মিষ্টি সুবাসযুক্ত একটু কড়া সুগন্ধি হলেও ক্ষতি নেই।
২। একান্ত প্রিয়জনের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে অন্তরঙ্গ সময় কাটানোর জন্য উষ্ণ, উদ্দীপক সুগন্ধি ব্যবহার করতে পারেন। কাঁধে, গলার নীচে বা ঘাড়ের পেছনে সুগন্ধির হালকা উপস্থিতি আপনার প্রতি সঙ্গীর আকর্ষণ বাড়িয়ে দেবে নিঃসন্দেহে।
সুগন্ধির প্রকারভেদঃ
গন্ধের মাত্রা ও বৈশিষ্ট্য অনুসারে সুগন্ধি বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। সুগন্ধির মাত্রা নির্ভর করে এর মূল উপাদান সুগন্ধি-তেল (Aroma Oil)-এর পরিমাণের ওপর। সুগন্ধি-তেল সবচেয়ে কম থাকে আফটারশেভে আর সবচেয়ে বেশি থাকে খাঁটি সুগন্ধিতে (PARFUM
গন্ধের বৈশিষ্ট্য অনুসারে সুগন্ধি প্রধানত চার প্রকারঃ ফ্রেশ, ফ্লোরাল, ওরিয়েন্টাল ও উডি (কাঠ-গন্ধি)।
১। সাধারণভাবে ফ্রেশ ও ফ্লোরাল সুগন্ধি মৃদু ও মিষ্টি সুবাসের হয়ে থাকে বলে দিনের বেলায়, কাজের সময় বা আউটডোর ইভেন্টে ব্যবহারের উপযোগী। এ ধরণের সুগন্ধি আপনাকে সারাদিন সুরভিত, সতেজ ও তারুণ্যময় রাখবে।
২। বিষন্ন, মেঘলা, ছুটির দিনে যখন সূর্যের দেখা মেলে না–একটা উদাস, মন-খারাপ ভাব থাকে–তখন ব্যবহার করুন ফ্লোরাল সুগন্ধি। মন ভাল হয়ে যাবে।
৩। ওরিয়েন্টাল ও কাঠ-গন্ধি সুগন্ধি সাধারণত কড়া সুবাসের হয় বলে সন্ধ্যার বা রাতের সামাজিক অনুষ্ঠান ও অন্তরঙ্গ সময়ের জন্য ভাল। এ ধরণের সুগন্ধি অন্যের কাছে আপনাকে আকর্ষণীয় করে তুলবে। তবে সুগন্ধির মাত্রা বা ব্যবহারে পরিমিতির দিকে খেয়াল রাখুন।
৪। শীতের হিমেল সন্ধ্যায় ব্যবহার করুন কড়া, কাঠ-গন্ধি সুগন্ধি। একটি উষ্ণ অনুভূতি ছড়িয়ে পড়বে আপনার চারপাশে।
সুগন্ধির লিঙ্গভেদ
সুগন্ধি হতে পারে নারীদের জন্য (Pour Femme), পুরুষদের জন্য (Pour Homme)কিংবা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য (PARFUM
১। মেয়েদের কাছে ফ্লোরাল বা ওরিয়েন্টাল সুগন্ধির কদর বেশি। তবে আজকাল আপেল, পীচ, চেরী ও কমলালেবুসহ অন্যান্য ফলের মিষ্টি সুবাসযুক্ত ফ্রেশ বা ফ্রুটি সুগন্ধিও কম-বয়সী বা চাকুরিজীবী মেয়েদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
২। ছেলেদের জন্য উপযোগী হল ফ্রেশ ও কাঠ-গন্ধী সুগন্ধি। দিনের বেলায়, কাজের সময় ব্যবহারের জন্য ফ্রেশ সুগন্ধিই ভাল। আর বিশেষ উপলক্ষ্য বা সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য কাঠ-গন্ধী সুগন্ধি ব্যবহার করুন।
৩। কিন্তু তাই বলে ছেলেরা কি মেয়েদের সুগন্ধি ব্যবহার করতে পারে না? অবশ্যই পারে। কোন পুরুষ যদি ‘শ্যানেল নাম্বার ফাইভ’ ব্যবহার করেই ফেলে, তবে তাতে সে ‘মেয়ে’ হয়ে যাবে না কিংবা একেবারে ‘মহাভারত’ অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।
কীভাবে মাখবেন
১। সুগন্ধি ব্যবহারের আগে গোসল করে নেয়া ভাল।
২। সুগন্ধি মাখার জন্য শরীরের সবচেয়ে কার্যকর অংশ হল বিভিন্ন ‘পাল্স-পয়েন্ট’ বা শিরা-বিন্দু, যেমন, হাতের কবজি, গলা, ঘাড় বা কানের লতির পেছনের অংশ–যেখানে রক্ত চলাচল বেশি হয়। কারণ রক্তের তাপ সুগন্ধির গন্ধের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
৩। সুগন্ধির বোতলের মুখ পাল্স-পয়েন্টের আনুমানিক ছয় ইঞ্চি দূরে রেখে কয়েকবার স্প্রে করুন। সুগন্ধিটি ক্রীম বা লোশন টাইপের হলে জায়গামত লাগিয়ে খুব হালকাভাবে ডলুন।
৪। এছাড়া আপনার সামনের বাতাসে সুগন্ধি স্প্রে করে তার ভেতর দিয়ে হেঁটে যান। এতে সুগন্ধির একটা হালকা কুয়াশা আপনার সারা গায়ে ছড়িয়ে পড়বে।
৫। বেশিক্ষণ ধরে সুগন্ধির গন্ধ বা কার্যকারিতা ধরে রাখতে ‘লেয়ারিং’ করতে পারেন। লেয়ারিং হল, বিভিন্ন প্রকারের সুগন্ধি দ্রব্য যেমন, শাওয়ার জেল, বডি লোশন, আফটার শেভ, ডিওডোরেন্ট, ও-দ্য-কলোন, ইত্যাদি ম্যাচিং করে পরপর, একসাথে ব্যবহার করা। তবে এক্ষেত্রে বিভিন্ন গন্ধ মিশে ‘রাসায়নিক বোমা’ হয়ে যাচ্ছেন কিনা, অবশ্যই খেয়াল রাখুন। তাই এজন্য একই ব্র্যান্ডের, যতদূর সম্ভব একই গন্ধের সুগন্ধি দ্রব্য ব্যবহার করা ভাল।
৬। সুগন্ধি মাখবেন পোশাক পরার আগেই। কখনই গায়ের পোশাকে সুগন্ধি মাখবেন না বা স্প্রে করবেন না।
এই হল অল্প কথায় সুগন্ধির তত্ত্ব-তালাশ ও ব্যবহারের সাধারণ নিয়ম-রীতি। আরও জানতে চাইলে আন্তর্জাল বা ইন্টারনেট তো আছেই।


No comments:
Post a Comment
Thank you very much.